উদ্বোধনের দিনেই স্কুল ফিডিংয়ে হযবরল: শিশুদের পাতে ‘অখাদ্য’ কাঁচা কলা, খাবার পায়নি ৪০ স্কুল
উদ্বোধনের দিনেই স্কুল ফিডিংয়ে হযবরল: শিশুদের পাতে ‘অখাদ্য’ কাঁচা কলা, খাবার পায়নি ৪০ স্কুল | ফটো: প্রিয় আনোয়ারা
নিজস্ব প্রতিবেদক, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) | ৩০ মার্চ, ২০২৬
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’র উদ্বোধন করা হলেও প্রথম দিনেই মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি । উপজেলার ১১০টি স্কুলের মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুলের ১০ হাজার শিক্ষার্থী উদ্বোধনী দিনে কোনো খাবারই পায়নি । অন্যদিকে, যেসব স্কুলে খাবার পৌঁছেছে, সেখানে সরকারি মেনু লঙ্ঘন করে শিশুদের দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ কাঁচা ও খাওয়ার অযোগ্য কলা এবং উৎপাদনের তারিখবিহীন নিম্নমানের বনরুটি । শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতের এই মহতী উদ্যোগ শুরুতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনার বলির পাঁঠা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২৯ মার্চ ২০২৬, রবিবার সকাল ১০টায় আনোয়ারা উপজেলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার । অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টির মান উন্নয়নের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীদের খাবার না পাওয়ার খবর আসতে শুরু করে ।
আনোয়ারা সরস্বতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তৈলারদ্বীপ বারখাইন এবং উত্তর গুয়াপঞ্চক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ৪০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল ৪টা পর্যন্ত খাবারের অপেক্ষায় থেকে শেষ পর্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরেছে । অনেক শিক্ষার্থী খাবার পাওয়ার আশায় বাসা থেকে টিফিন আনেনি বলে জানা গেছে ।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী (চিত্র ১ দ্রষ্টব্য), রবিবার শিক্ষার্থীদের মেনু ছিল ‘বনরুটি এবং সিদ্ধ ডিম’। অথচ মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেনু তোয়াক্কা না করে শিক্ষার্থীদের ‘কাঁচা কলা’ সরবরাহ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই কলাগুলো ছিল সম্পূর্ণ সবুজ ও পরিপক্কতাহীন।
নেটিজেন ও অভিভাবকদের অভিযোগ,অত্যন্ত সস্তা মূল্যে সংগৃহীত এই কাঁচা কলাগুলো খাওয়ার উপযোগী ছিল না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা কলায় থাকা ‘প্রতিরোধী স্টার্চ’ (Resistant Starch) শিশুদের পেটে গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজমের সমস্যা তৈরি করতে পারে । এছাড়া বনরুটির প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ না থাকায় খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ।
খাবার না পৌঁছানোর বিষয়ে দায়বদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘স্বদেশপল্লী’র প্রকল্প পরিচালক তাসনিম এক আজব অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, “আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকার কোনো পাম্প সকালে তেল না দেওয়ায় ৫টি গাড়ি খাবার নিয়ে বের হতে পারেনি” । তবে সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মতে, এটি কেবল একটি খোঁড়া অজুহাত; মূলত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও সদিচ্ছার অভাবেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (টিপিইও) মো: হিন্দোল বারী খাবার না পৌঁছানোর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “৪০টির মতো বিদ্যালয়ে খাবার যায়নি। বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে” । ইউএনও তাহমিনা আক্তার জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে জরুরি বৈঠকে বসা হবে এবং কেন এমনটি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে ।
আনোয়ারার এই বিপর্যয়ের দিনে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ভোলার উপকূলীয় এলাকা ও পিরোজপুরে। সেখানে ‘গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (GJUS)’ নামক এনজিওর মাধ্যমে ৪১৫টি স্কুলে সফলভাবে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হয়েছে । বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্যিক ঠিকাদারের তুলনায় এনজিওর মাঠ পর্যায়ের নেটওয়ার্ক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা স্কুল ফিডিং বাস্তবায়নে বেশি কার্যকর ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে, তখন আনোয়ারার এই ‘খাদ্য সিন্ডিকেট’ প্রকল্পের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে । অভিভাবক আরমান হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “ঠিকাদার শিশুদের নিয়ে তামাশা শুরু করেছে। দ্রুত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
আনোয়ারার বঞ্চিত ১০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা পূরণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন সমাজ ।